শতকোটির জমি গিলে খাওয়া সেই ‘আদু ভাই’ এবার নেমেছেন, হুমকি বাণিজ্যে

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে উন্মোচিত হয়েছিল জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) ঢাকা ডিভিশন-১ এর আলোচিত সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী জোয়ারদার তাবেদুন নবীর দুর্নীতির হিমশৈল। তবে আজকের পর্ব কেবল ৬ কোটি টাকার উৎকোচ কিংবা ২০ একর সরকারি জমি দখলের গল্প নয়—এটি সরকারি চেয়ারে বসে তৈরি করা এক অন্ধকার ‘উৎকোচ সাম্রাজ্য’ এবং সত্য ঢাকতে হুমকী বাহিনীর নজিরবিহীন উপাখ্যান! 

🔘 তানিয়ার সাথে প্রেমের আখড়া, ভেতরে গোপন কারবার:

‎জাতীয় গৃহায়নের ঢাকা ডিভিশন-১ কার্যালয়ে প্রতিদিন চলত এক অবিশ্বাস্য নাটক। অভিযোগ রয়েছে, অফিস চলাকালীন সময়েই কক্ষের দরজা বন্ধ করে রহস্যময়ী অ্যাডভোকেট তানিয়া রহমানের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতেন তাবেদুন নবী।

‎সবচেয়ে বিস্ময়কর ও নজিরবিহীন বিষয়—তানিয়ার নিজের স্বামী সেই রুদ্ধদ্বার কক্ষের বাইরে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে থাকতেন, যাতে অন্য কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী ভেতরে ঢুকতে না পারেন! দাপ্তরিক মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে এই রুদ্ধদ্বার কক্ষে বসেই সিদ্ধান্ত হতো—মিরপুরের কোন ফাইল ছাড় পাবে আর সরকারি কোন জমি কার দখলে যাবে। এই তানিয়াকে মধ্যস্থতাকারী বানিয়েই অসংখ্য প্লট ও ফ্ল্যাট নিজের নামে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।

🔘 ক্ষমতার রূপ বদলে অঘোষিত ‘কালো সিন্ডিকেট’ রাজত্ব:

‎লুটপাটের এই রাজত্বে তাবেদুন নবী একা ছিলেন না। তার ছায়াসঙ্গী হিসেবে ছিলেন শেখ সোহেল রানা, ইমামুল, শাহরিয়ার জনি এবং রাদিউজ্জামান। এই চক্রটি মিরপুরের বাউনিয়া মৌজাকে প্রায় তাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছিল। নামজারি থেকে শুরু করে আবাসিক প্লটকে রাতারাতি বাণিজ্যিক বা শিল্প প্লটে রূপান্তর—সবকিছুতেই চলত তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য।

সাবেক শাসনামলের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে যে ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করা হয়েছিল, তার সামনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ছিলেন স্রেফ পুতুল। রাজনীতির হাওয়া বদলালেই খোলস পাল্টে ফেলেন এই প্রকৌশলী। নিজেকে কখনো সাবেক ছাত্রদল নেতা, কখনো প্রভাবশালী সচিবের ভাই পরিচয় দিয়ে নিজের অপরাধ আড়াল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন তিনি।

‎🔘 বদলির আগের দিন ৬ কোটির ‘জুয়া’: নিঃস্ব শত পরিবার:

‎২০ আগস্ট ২০২৪। বদলির ঠিক আগের দিন, বিদায় ঘণ্টার মুখে দাঁড়িয়ে জীবনযুদ্ধে বড় ‘কালো জুয়াটি’ খেলেন তাবেদুন নবী। ‘মহিউদ্দিন গং’-এর কাছ থেকে সরাসরি ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে বাউনিয়া মৌজার ২০ একর বহুমূল্যবান সরকারি জমির ওপর থেকে বছরের পর বছর ধরে থাকা নিষেধাজ্ঞা এক কলমের খোঁচায় তুলে দেন তিনি।

‎ফলাফল? রাতারাতি আলিনগর, হ্যাভিলি লিমিটেড, এ্যাসিউর, সাগুপ্তা হাউজিংসহ ১৭টি ভূমিদস্যু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি সরকারি জমিতে পাইলিংয়ের কাজ শুরু করে। এই এক রাতের সিদ্ধান্তে নিঃস্ব হয়ে যায় শত শত মধ্যবিত্ত পরিবার, যারা স্বপ্ননগর-২ প্রকল্পের পাশে এক টুকরো জমির আশায় জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ঢেলে দিয়েছিলেন।

‎সন্দেহের তির এখন সেগুনবাগিচার দিকেও। তৎকালীন চেয়ারম্যানের সভাকক্ষে হওয়া সেই গোপন মিটিংয়ে উপস্থিত আইন কর্মকর্তা ও নীতি-নির্ধারকরা কি কেবল দর্শক ছিলেন, নাকি ৬ কোটি টাকার ঘুষের ভাগ ওপরের মহলেও পৌঁছেছিল?

🔘 গোপন চুক্তিতে ও লাখ টাকার ‘মিডিয়া ম্যানেজ’ মিশন:

‎দুর্নীতির তথ্য ফাঁস হওয়া ঠেকাতে মিডিয়া পকেটে পুরার এক নজিরবিহীন খেলায় তাবেদুন নবী। দৈনিক জনকথা, বর্তমান কথা, আজকের দর্পণসহ বিভিন্ন অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়াকে ২০ থেকে ৩০ হাজার এমনকি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছিটিয়ে সংবাদের মুখ বন্ধ করার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে ‘দৈনিক ভোরের নতুন বার্তা’ পত্রিকায় খবর প্রকাশ হলে তাবেদুন নবী হজ্জে থাকা অবস্থাতেই মতিঝিলস্থ “এস আর প্রিন্টিং প্রেসের মালিকের মাধ্যমে” গোপন সমঝোতা বৈঠক করান। সেই সময় তাবেদুন নবী পবিত্র হজ্জ করতে মক্কায় ছিলেন। হজ্জে থেকেও মধ্যস্তর দিয়ে করা সেই অভাবনীয় লেনদেনের চেক, সমঝোতা চুক্তি ও সমস্ত অডিও-ভিডিও রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে। 

‎শুধু তাই নয় সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলে কয়েকজন ব্যাক্তি নাসির উদ্দিন পিন্টু, ওসমান গনি বাবুল এবং আরিফসহ তাদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে—সেই একই স্থানে আর কতটি গণমাধ্যমকে ম্যানেজ করার গোপন চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল? এবিষয়ে জানতে এস আর প্রিন্টিং প্রেসের মালিকের বক্তব্য পাওয়া যায় নি। পাওয়া গেলে পরবর্তী পর্বে যুক্ত করা হবে।

🔘 ‎সংবাদ প্রকাশ হতেই বেড়িয়ে এলো আসল চেহারা:

 

১০-১৫ জনের হুমকি বাহিনী:

দৈনিক বাংলাভিউ পত্রিকায় জোয়ারদার তাবেদুন নবীর অপকর্মের পর পর ২ পর্বের সংবাদ প্রকাশের পর তিনি নিজে প্রথমে প্রতিবেদক ও অফিস ডেস্কে ‘নিরীহ’ মেসেজ পাঠান। কিন্তু অফিস কর্তৃপক্ষ ও প্রতিবেদক এতে সাড়া না দেওয়ায় উন্মোচিত হয় তার আসল হিংস্র রূপ।

‎নিজেকে আড়াল করতে প্রথমেই ‘দেশ টিভি’র সাংবাদিকের পরিচয় দেন তার ভাই। তাতেও কাজ না হলে আহসান উল্লাহ, দর্পণ প্রতিদিন, গাজী আনোয়ার, আবুল কালাম, মালেক হায়াতসহ অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন দালাল ও বিতর্কিত ব্যক্তিকে দিয়ে তিনি প্রতিবেদক ও অফিস ডেস্কে ফোন করিয়ে সরাসরি হুমকি দেওয়া শুরু করেন। এমনকি নিজেই আইনি ও বেআইনি নানা উপায়ের কথা বলে হুমকী প্রদানের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

‎🔘 ‘তিরস্কার পত্র’ কি দুর্নীতিবাজদের জন্য সবুজ সংকেত?

‎তৎকালীন তাবেদুন নবী বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ের তদন্তে’র পর বিভাগীয় মামলাও রুজু হয়েছিলো। কিন্তু হাজার কোটি টাকার তছরুপ এবং ৬ কোটি টাকার সরাসরি ঘুষের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তার সাজা হয়েছে কেবল এক টুকরো ‘তিরস্কার পত্র’!

‎মিরপুরের কোটি কোটি টাকার সরকারি জমি আজও ১৭টি দখলদার কোম্পানির ইটের নিচে চাপা পড়ে আছে। বর্তমান কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযানে যেতে চাইলেও অদৃশ্য এক বলয়ের প্রভাবে সব থমকে যাচ্ছে। দেশবাসীর এখন একটাই প্রশ্ন—তাবেদুন নবীর মতো রাঘববোয়ালরা কি স্রেফ একটি প্রহসনের ‘তিরস্কার’ পকেটে নিয়ে পার পেয়ে যাবেন, নাকি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের দায়ে তারা অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন?

‎❗অনুসন্ধান চলমান, চোখ রাখুন পরবর্তী পর্বে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *