সরকারি অফিসে প্রমোদালয় ও সাংবাদিক বিক্রির চাঞ্চল্য
প্রথম পর্বে উন্মোচিত হয়েছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত দপ্তরের আলোচিত প্রকৌশলী জোয়ারদার তাবেদুন নবীর দুর্নীতির হিমশৈল। তবে আজকের পর্ব কেবল ৬ কোটি টাকার ঘুষ কিংবা ২০ একর জমি দখলের সনাতনী গল্প নয়—এটি সরকারি চেয়ারে বসে গড়ে তোলা এক গোপন ‘মক্ষীরাণী সাম্রাজ্য’ এবং সত্য ঢাকতে গণমাধ্যম কেনার রোমাঞ্চকর উপাখ্যান!

অফিস যখন ‘প্রমোদালয়’: পাহারায় রহস্যময়ীর স্বামী
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকা ডিভিশন-১ এর কার্যালয়ে কান পাতলেই শোনা যায় এক অবিশ্বাস্য গল্প। অভিযোগ উঠেছে, অফিস চলাকালীন সময়েই কক্ষের দরজা বন্ধ করে রহস্যময়ী অ্যাডভোকেট তানিয়া রহমানের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতেন তাবেদুন নবী।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়—তানিয়ার নিজের স্বামী সেই রুদ্ধদ্বার কক্ষের বাইরে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে থাকতেন, যাতে অন্য কেউ ভেতরে ঢুকতে না পারে! দাপ্তরিক মর্যাদা ধুলোয় মিশিয়ে এই কক্ষে বসে সিদ্ধান্ত হতো—মিরপুরের কোন ফাইল ছাড় পাবে আর কোন জমি কার দখলে যাবে। এই তানিয়া রহমানকে মাধ্যম বানিয়েই অসংখ্য প্লট ও ফ্ল্যাট নিজের নামে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।
তাবেদুন-সোহেল সিন্ডিকেটের তাণ্ডব
লুটপাটের রাজত্বে একা ছিলেন না তাবেদুন নবী। তার সহযোগী হিসেবে ছায়ার মতো ছিলেন শেখ সোহেল রানা, ইমামুল, শাহরিয়ার জনি এবং রাদিউজ্জামান। মিরপুরের বাউনিয়া মৌজাকে প্রায় ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করেছিল এই চক্র। নামজারি থেকে শুরু করে আবাসিক প্লটকে বাণিজ্যিক বা শিল্প প্লটে রূপান্তর—সবকিছুতেই চলত তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। সাবেক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে যে ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করা হয়েছিল, তার সামনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও ছিলেন কেবল পুতুল।
বদলি ঠেকাতে ‘মরণ-কামড়’: রাতারাতি নিঃস্ব শত শত পরিবার
২০ আগস্ট ২০২৪। বদলির ঠিক আগের দিন, বিদায় ঘণ্টা বাজার মুখে দাঁড়িয়ে বড় জুয়াটি খেলেন তাবেদুন নবী। মহিউদ্দিন গং-এর কাছ থেকে সরাসরি ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে বাউনিয়া মৌজার ২০ একর জমির ওপর থেকে বছরের পর বছর ধরে থাকা নিষেধাজ্ঞা এক কলমের খোঁচায় তুলে দেন তিনি।
ফলাফল? রাতারাতি ১৭টি ভূমিদস্যু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি সরকারি জমিতে পাইলিংয়ের কাজ শুরু করে। এক রাতের সিদ্ধান্তে নিঃস্ব হয়ে যায় শত শত মধ্যবিত্ত পরিবার, যারা স্বপ্ননগর-২ প্রকল্পের পাশে এক টুকরো জমির আশায় জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ঢেলে দিয়েছিলেন।
সত্য ঢাকতে ‘সাংবাদিক কেনা’র প্রমাণক!
দুর্নীতির পাহাড় চাপা দিতে মিডিয়া ম্যানেজের এক নজিরবিহীন খেলা খেলেছেন তাবেদুন নবী। অনুসন্ধানে মিলেছে সাংবাদিক ও অনলাইন-প্রিন্ট মিডিয়াকে পকেটে পুরার অকাট্য তথ্য-প্রমাণ।
মিডিয়া ম্যানেজ বাজেট: দৈনিক জনকথা, বর্তমান কথা, আজকের দর্পণসহ বিভিন্ন অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়াকে ১০ হাজার, ২০ হাজার, ৩০ হাজার এমনকি ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ছিটিয়ে সংবাদের মুখ বন্ধ করার স্পষ্ট প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
মে মাসের গোপন চুক্তি: মে মাসের শুরুতে ‘দৈনিক ভোরের নতুন বার্তা’ পত্রিকায় খবর প্রকাশ পাওয়ার পর এক পরিচিত সাংবাদিকের মাধ্যমে সমঝোতা বৈঠক, লেনদেন এবং চুক্তির সমস্ত তথ্য ও রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে।
রাজনীতির হাওয়া বদলের পর তাবেদুন নবী এখন নিজেকে বিএনপির সাবেক ছাত্রদল নেতা কিংবা প্রভাবশালী সচিবের ভাই পরিচয় দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
শাস্তির নামে প্রহসন ও সেগুনবাগিচার গোপন বৈঠক
মন্ত্রণালয়ের তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে, বিভাগীয় মামলাও রুজু হয়েছে। কিন্তু হাজার কোটি টাকার তছরুপ এবং ৬ কোটি টাকার সরাসরি ঘুষের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তার সাজা হয়েছে কেবল ‘তিরস্কার’! এই নামমাত্র সাজা কি দুর্নীতিবাজদের জন্য উল্টো সবুজ সংকেত?
প্রশ্ন উঠছে, এই মহা-দুর্নীতির খুঁটির জোর কোথায়? সেগুনবাগিচার সেই গোপন মিটিংয়ে আর কারা উপস্থিত ছিলেন? সেখানে উপস্থিত আইন কর্মকর্তা কিংবা নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারা কি কেবল দর্শক ছিলেন, নাকি ৬ কোটি টাকার ঘুষের ভাগ তাদের কাছেও পৌঁছেছিল?
মিরপুরের সরকারি জমি এখনও ১৭টি দখলদার কোম্পানির ইটের নিচে চাপা পড়ে আছে। বর্তমান কর্তৃপক্ষ উচ্ছেদ অভিযানে যেতে চাইলেও অদৃশ্য এক শক্তির প্রভাবে সব থমকে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন—তাবেদুন নবীর মতো রাঘববোয়ালরা কি স্রেফ একটি ‘তিরস্কার’ পত্র পকেটে নিয়ে পার পেয়ে যাবেন, নাকি আইনের আওতায় আসবেন?
(চোখ রাখুন পরবর্তী পর্বে…)