বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়টি বর্তমানে পুরোপুরি নয়াদিল্লির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর দ্রুত দিল্লি সফর করেন। উদ্দেশ্য ছিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে ঢাকার সুনির্দিষ্ট বার্তা পৌঁছে দেওয়া। গত ১১ই আগস্ট সন্ধ্যায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ত্রিবেদীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সেই আলোচনার ফিরতি বার্তা নিয়ে শুক্রবার বিকেলে ঢাকায় ফিরেছেন তিনি। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, আজ দিনের যেকোনো সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন ভারতীয় হাইকমিশনার। এই আলোচনার পরই স্পষ্ট হবে প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাচ্ছেন কি না। নয়াদিল্লির কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেলে এ মাসেই সফরের সম্ভাবনা রয়েছে, অন্যথায় ঢাকা বিকল্প পথে হাঁটতে পারে।
শেখ হাসিনার পতনের পর দুই দেশের সম্পর্কে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে ভারত তৎপর। গত ১২ই জুন ঢাকায় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দীনেশ ত্রিবেদী সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গত ১০ই আগস্ট তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবার সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে বাংলাদেশের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে ৩০শে জুলাই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের সময় ত্রিবেদী জানিয়েছিলেন, ভারত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। মূলত এরপর থেকেই সফরের আলোচনা গতি পায়, যদিও বাংলাদেশ সরকার বারবার জানিয়েছে যে এখনো কোনো দিনক্ষণ চূড়ান্ত হয়নি।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড। গত ৫ই আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্ট ক্লাবের অনলাইন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
এর দুই দিন আগেই ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে সতর্ক করা হয়েছিল যে, হাসিনা ভারতে বসে অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ পেলে তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে আঘাত হানবে। কিন্তু ভারত সরকার তাকে বিরত রাখতে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এই ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা। গত ৯ই আগস্ট পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে ভারতীয় হাইকমিশনারকে ঢাকার ক্ষোভের বিষয়টি সরাসরি জানানো হয়। ড. খলিল আশা প্রকাশ করেছেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ঢাকার উদ্বেগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করবে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েনের পাশাপাশি হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটিও এখন ঢাকার অন্যতম প্রধান দাবি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর ত্রিবেদী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। এসব বৈঠকে ঢাকা বারবার দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনুকূল পরিবেশ তৈরির তাগিদ দিয়েছে।
ভারতীয় দূত অবশ্য সাংবাদিকদের ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, দুই দেশের সরকার প্রধানের সরাসরি আলোচনার মাধ্যমেই অনেক জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব। তবে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর মালয়েশিয়ায় এবং দ্বিতীয় সফর চীনে হওয়ায় ভারত বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বেইজিং সফরের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতেই ত্রিবেদী প্রেসিডেন্টের কাছে পরিচয়পত্র জমা দিয়েছিলেন।
ব্রিকস সম্মেলন নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। গত ২৩শে জুলাই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরে ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে ঢাকা মনে করে, আমন্ত্রণপত্রটি যথাযথ ছিল না কারণ সেখানে তাকে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে ডাকা হয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরে স্পষ্ট করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রীকে ব্রিকসে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, বরং বিমসটেক চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ এসেছে। এই জটিলতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর ব্রিকস সম্মেলনে যোগদানের বিষয়টি প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এখন সব মিলিয়ে নয়াদিল্লির ফিরতি বার্তার ওপরই নির্ভর করছে দুই দেশের পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
ঢাকায় পা রাখার ৫৯ দিন পর গত ১০ই আগস্ট প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাক্ষাৎ পান ত্রিবেদী।
ঢাকার সতর্কবার্তার পরেও হাসিনা কথা বলেন এবং বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে নিয়ে তীব্রভাবে বিষোদ্গার করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াটি ছিল নজিরবিহীন।
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার গঠনের আবহে সেই সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে ভারতকে বিশেষ মনোযোগী হতে দেখা যায়।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় গত এপ্রিলে ঢাকায় নতুন দূত প্রেরণের ঘোষণা দেয় দিল্লি।
এই ঘটনার দুইদিন আগে ত্রিবেদীকে ডেকে ঢাকার তরফে সতর্ক করা হয়েছিল।
পরে অবশ্য নয়াদিল্লিও দায়সারা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে নিয়ে হাসিনার কোনো বক্তব্যে তাদের সমর্থন নেই।
পাশাপাশি হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু ত্বরান্বিত করার বিষয়েও তাগাদা দেয়া হয়।
সরকার গঠনের পর প্রথমেই তারেক রহমানকে সফরে নেয়ার আগ্রহের কথা জানায় বাংলাদেশের সঙ্গে চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত ভাগ করে নেয়া প্রতিবেশী ভারত।
১৭ই ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নয়াদিল্লির সেই আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দেন দেশটির স্পিকার ওম বিড়লা।
সেখান থেকে দ্বিতীয় সফরে চীন যান ঢাকার জাতীয়তাবাদী সরকারের প্রধান।
এর পরের দিন প্রায় ১৮ মাস বন্ধ রাখা ভারতীয় ভিসা সেন্টার খোলার ঘোষণা দেয়া হয়।
দাওয়াত দেয়া হয়েছে বিমসটেক-এর চেয়ারম্যানকে।
ঢাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গর ঢাকায় আসার ঠিক একদিন আগে।
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোতে বলা হচ্ছে, আগামী সপ্তাহেই এ সফর হতে পারে।