ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি: নিখোঁজ ও প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে

ভূমধ্যসাগরে গ্রিসগামী একটি নৌকায় খাবার ও পানির তীব্র সংকটে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। বেঁচে যাওয়া এক বাংলাদেশির ভাষ্যমতে, মৃতদের মধ্যে ৯ জন বাংলাদেশি। কায়রোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো. জাকির হোসেন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দূতাবাসের কর্মকর্তারা স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামের আবদুল করিমের সঙ্গে কথা বলেছেন।

আবদুল করিমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট ৪২ জন যাত্রী লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। যাত্রীদের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি এবং চারজন সুদানের নাগরিক ছিলেন। সাগরে প্রায় ১১ দিন ভেসে থাকার পর ১৩ আগস্ট নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছায়। স্থানীয়রা নৌকাটি দেখে পুলিশকে খবর দিলে ২৯ থেকে ৩০ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারা বর্তমানে পুলিশের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। দূতাবাস বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলার জন্য অনুমতি চেয়েছে।

আবদুল করিমের ভিডিও বার্তায় উঠে এসেছে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। তিনি জানান, নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ার পর খাবার ও পানি ফুরিয়ে যায়। প্রচণ্ড গরমে চোখের সামনে ৯ জন বাংলাদেশি এবং আরও দুজন যাত্রী মারা যান। মরদেহগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন তারা। এছাড়া দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকায় বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের শরীরের বিভিন্ন অংশে পচন ধরেছে। করিম আরও জানান, রাবারের নৌকাটিতে সর্বোচ্চ ২৫ জনের ধারণক্ষমতা থাকলেও ৪২ জনকে তোলা হয়েছিল এবং এতে মাত্র একটি ইঞ্জিন ছিল। তবে মিশরের পুলিশ দূতাবাসকে জানিয়েছে, সাগরে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করার মতো কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যানুযায়ী, লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে যাওয়া যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের সংখ্যা বর্তমানে শীর্ষে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে অন্তত ৩ হাজার ৬০৮ জন বাংলাদেশি এই পথে গ্রিসে পৌঁছেছেন। ব্র্যাকের তথ্যমতে, ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি এই রুট ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। এর আগে গত মার্চ মাসে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছিল, যাদের মধ্যে ১২ জনই ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান এই পরিস্থিতিকে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া মানবপাচার রোধ করা কঠিন। এদিকে, শান্তিগঞ্জের অন্তত পাঁচ যুবকের এখনো কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তারা হলেন হৃদয় পাল, এনামুল খান, রিপন মিয়া, মামুন খান এবং মো. তালহা।

হৃদয় পালের চাচা কানন পাল জানান, ৩১ জুলাই সর্বশেষ কথা হওয়ার সময় হৃদয় জানিয়েছিলেন ৩ আগস্ট তিনি গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেবেন। দুটি নৌকার মধ্যে হৃদয় দ্বিতীয়টিতে ছিলেন বলে তারা জানতে পেরেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী দালালরা পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করছে যে তাদের সন্তানরা বেঁচে আছেন এবং তাদের গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলার পরামর্শ দিচ্ছে। করিমের পরিবারসহ আরও কয়েকটি পরিবার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

এই সুযোগ পাওয়া গেলে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে জানান তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবদুল করিমের একটি ভিডিও ইতোমধ্যে ছড়িয়ে গেছে।তালিকায় পরের অবস্থানে রয়েছে সুদান ও আফগানিস্তান।

ব্র্যাকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২১ মার্চ লিবিয়ার তব্রুক থেকে নৌকাটি যাত্রা করে। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইউরোপে যাওয়ার এই পথটি ‘সেন্ট্রাল মেডিটেরিয়ান রুট’ নামে পরিচিত।

ব্র্যাক জানায়, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ২০ হাজার ২৫৯ বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেন। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪ হাজার ২৪৯ জন ইতালিতে এবং ৩ হাজার ৬০৮ জন লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে পৌঁছেছেন।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, কয়েক বছর ধরে ইতালির উদ্দেশে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া যাত্রীদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি।

‘এসব ঘটনা বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে,’ বলেন শরিফুল এরপর থেকে পরিবারের সদস্যরা তার কোনো খোঁজ পাননি।

(এই প্রতিবেদনে সিলেট প্রতিনিধি তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *