দীর্ঘদিন ধরে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত ব্রিটিশ আমলের উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে স্বাধীনতার প্রায় আট দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পর সেই চিত্র এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন।
নয়াদিল্লি বর্তমানে বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক শক্তি গড়ে তোলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে ১৯৫৮ সালে যাত্রা শুরু করা ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন বা ডিআরডিও।
সংস্থাটির নিরলস গবেষণা এবং সরকারি বিনিয়োগের সমন্বয়ে ভারত এখন স্থল, আকাশ ও সমুদ্র—এই তিন ক্ষেত্রেই নিজেদের সামরিক সক্ষমতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ভারত এক বিশাল মাইলফলক স্পর্শ করেছে। নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার পাশাপাশি মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য এমআরএসএএম যুক্ত হওয়ায় দেশটির আকাশসীমা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সুরক্ষিত।
একই সঙ্গে রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০, বারাক-৮, স্পাইডার এবং কিউআরএসএএমের মতো অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভারতের আকাশসীমাকে শত্রুপক্ষের যেকোনো হুমকি থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় দেশীয় প্রযুক্তির উন্নয়ন ভারতের এই প্রতিরক্ষা বলয়কে আরও শক্তিশালী ও বহুমুখী করে তুলেছে।
ভারতের সামরিক শক্তির আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র এক অবিসংবাদিত নাম। ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র স্থল, সমুদ্র ও আকাশ—যেকোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে নিক্ষেপ করা সম্ভব। ব্রহ্মোসের উচ্চগতি এবং নির্ভুল লক্ষ্যভেদের সক্ষমতা ভারতের স্থল ও নৌ প্রতিরক্ষাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এছাড়া পৃথ্বী, অগ্নি ও আকাশের মতো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মাধ্যমে ভারত নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির এক মজবুত ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা দেশটির দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্থলবাহিনীর আধুনিকায়নের ক্ষেত্রেও ভারত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রচলিত ট্যাঙ্ক ও কামানের পাশাপাশি এখন রকেট সিস্টেম, আধুনিক রাডার, ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পিনাকা রকেট সিস্টেম এবং বিভিন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থলবাহিনীর আক্রমণাত্মক ও রক্ষণাত্মক সক্ষমতাকে শক্তিশালী করেছে। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি এবং দ্রুততম সময়ে শত্রুর মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ভারতের সামরিক কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও ভারত আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগিয়েছে। যুদ্ধজাহাজগুলোতে বিমান ও জাহাজবিধ্বংসী হুমকি মোকাবিলায় নতুন নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে বারাক-৮ বা এলআর-এসএএম এবং ভিএল-এসআরএসএএমের মতো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রতিরক্ষা শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দূরবর্তী অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি জানান দিতে ভারত নৌবাহিনীর আধুনিকায়নকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
আধুনিক যুদ্ধের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে ড্রোনের গুরুত্ব অনুধাবন করে ভারত এ খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। টাপাস, রুস্তম, আর্চার, ঘাতক ও সুইফটের মতো ড্রোনগুলো দেশীয় প্রযুক্তিতে উন্নয়নের মাধ্যমে ভারত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারিতে নতুন সক্ষমতা অর্জন করেছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি ভারতের সামরিক গবেষণার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, হাইপারসনিক প্রযুক্তি, সেন্সর এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মতো আধুনিক ক্ষেত্রে গবেষণা চালিয়ে ভারত নিজেকে এক শক্তিশালী সামরিক শক্তিতে পরিণত করছে।