রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বন্ধ ও লোকসানি শিল্পকারখানাগুলোর বিশাল জমি ও বিদ্যমান অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ২০ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটি ছিল এই বিষয়ে আয়োজিত ধারাবাহিক আলোচনার তৃতীয় বৈঠক।
বৈঠকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্য, শিল্প ও বস্ত্র-পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, বিডা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক সরকারের মূল দায়িত্ব হলো উন্নয়নের পথে থাকা বাধাগুলো দূর করা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কার্যকর পথ তৈরি করা। সরকার একা সব দায়িত্ব পালন করতে পারে না উল্লেখ করে তিনি দেশের শিল্পোদ্যোক্তাদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আসুন আমরা সবাই মিলে পরিবর্তন আনি। সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ আছে, তবে সবাই একসঙ্গে কাজ করলে এসব বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।”
আলোচনায় পাঁচটি রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনের চেয়ারম্যানরা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন কারখানাগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি), বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি)।
বৈঠকে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের আহসান খান চৌধুরী, কাজী ফার্মসের কাজী জাহেদুল হাসান, মেঘনা গ্রুপের মোস্তফা কামাল, ট্রান্সকম গ্রুপের সিমিন রহমান, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের তামারা হাসান আবেদ, নাবিল গ্রুপের আমিনুল ইসলাম, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের পারভেজ সাইফুল ইসলাম, এসিআইয়ের আরিফ দাউদ এবং আকিজ ভেঞ্চার গ্রুপের এস কে শামীম উদ্দিনসহ দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এছাড়া জাপানের মারুবেনি, টয়োটা সুশো, সুমিতোমো, মিতসুই, মুফজি ব্যাংক, সোজিৎস এশিয়া, জেট্রো এবং জাপান দূতাবাসের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তামারা হাসান আবেদ জানান, তারা ভোজ্যতেল ও চিনি খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী এবং শিগগিরই সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দেবেন। নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম সেতাবগঞ্জ ও রাজশাহী সুগার মিলের বিষয়ে আগ্রহের কথা জানান। বিশেষ করে শ্যামপুর, পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, পাবনা ও রাজশাহী সুগার মিলগুলো এখন বেসরকারি বিনিয়োগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) তাদের মিলগুলোর জমি ও অবকাঠামো নতুন বিনিয়োগ কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। অন্যদিকে, বিজেএমসি তাদের ২৫টি পাটকল লিজ, হস্তান্তর বা নতুন ব্যবস্থাপনায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে, যার মধ্যে ঢাকার ডেমরার লতিফ বাওয়ানি ও করিম জুট মিল অন্যতম। বিটিএমসি ১৬টি টেক্সটাইল মিলকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) মডেলে পরিচালনার জন্য প্রস্তুত করেছে, যার মধ্যে দিনাজপুর টেক্সটাইল মিল, টাঙ্গাইল কটন মিল ও আরমিন টেক্সটাইল উল্লেখযোগ্য।
বিসিআইসি বন্ধ কারখানাগুলোর জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে, যেখানে চট্টগ্রাম কেমিক্যাল কমপ্লেক্সকে একটি বড় বিনিয়োগ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিএসইসি প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ, জেমকো, অ্যাটলাস বাংলাদেশ এবং বগুড়ায় নতুন স্টিল কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব তুলে ধরেছে।
বৈঠকে উপস্থিত শিল্পপতিরা প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তাদের মতে, বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু হলে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিক শিল্পখাতে নতুন গতির সঞ্চার হবে।