বাইরে চলন-বলন একদম সাদামাঠা ‘আদু ভাই’য়ের মতো। কিন্তু এই নিরীহ অবয়বের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি সাম্রাজ্যের গল্প। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) ঢাকা ডিভিশন-১ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী জোয়ারদার তাবেদুন নবীর বিরুদ্ধে উঠে এসেছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।
অফিসের গোপন কক্ষে অপকর্ম থেকে শুরু করে জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি জমি ছাড়পত্র প্রদান, বীর মুক্তিযোদ্ধার কাছে ঘুষ দাবি এবং অবৈধ ‘কোটা’ বানিয়ে ফ্ল্যাট-প্লট ভাগাভাগি—সবত্রই ছড়িয়ে রয়েছে তার একক ও সিন্ডিকেট আধিপত্য।
বদলির আগের দিন ৬ কোটির ‘ম্যাজিক’ ও ভূমিদস্যু প্রেম
তাবেদুন নবীর সবচেয়ে বড় থাবাটি পড়েছে মিরপুরের বাউনিয়া মৌজার (৯ নং সেকশন, স্বপ্ননগর-২ প্রকল্পের উত্তর পাশ) সরকারি সম্পত্তির ওপর। এল. এ. কেস ও সরকারি গেজেটভুক্ত ২০.০১ একরের এই বহুমূল্যবান জমিটি দীর্ঘদিন ধরে আলিনগর, হ্যাভিলি লিমিটেড, এ্যাসিউর, সাগুপ্তা হাউজিংসহ ১৭টি প্রভাবশালী কোম্পানি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছিল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বদলির আদেশ আসার পর দায়িত্ব হস্তান্তরের ঠিক আগের দিন (২০ আগস্ট ২০২৪) গৃহায়ন ডিভিশন-১ এর স্মারক নং ৩০১৫-এর মাধ্যমে পূর্বের সব নিষেধাজ্ঞা রাতারাতি প্রত্যাহার করে নেন তাবেদুন নবী। রাজউক, সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং সাব-রেজিস্ট্রার অফিসকে চিঠি পাঠিয়ে সেই পথ সুগম করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ‘মহিউদ্দিন গং’ নামক একটি চক্রের কাছ থেকে প্রায় ৬ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণের বিনিময়ে এই নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট (NOC) ইস্যু করেন তিনি। সেগুনবাগিচায় তৎকালীন চেয়ারম্যানের সভাকক্ষে এক গোপন বৈঠকের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশেই এই সিদ্ধান্ত হয়। এই একটি চিঠির সুবাদে ভূমিদস্যুরা দেদারসে সরকারি জমি রেজিস্ট্রেশন ও বহুতল ভবন নির্মাণের সুযোগ পায়, যার বলির পাঁঠা হয়ে আজ নিঃস্ব শত শত সাধারণ ফ্ল্যাট ক্রেতা পরিবার।
দফতরজুড়ে অনৈতিক কাণ্ড ও প্রভাবশালীদের ছায়া
বিবাহিত এই প্রকৌশলীর অফিস কক্ষকে ব্যক্তিগত ‘প্রেমের আখড়া’ বানানোরও নজিরবিহীন অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তানিয়া রহমান নামের এক নারীর নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার অফিসে। কথিত আছে, তানিয়ার স্বামী বাইরে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতেন, আর ভেতরে চলতো তাদের একান্ত সময় কাটানো। সাধারণ দর্শনার্থী তো দূরের কথা, ওই সময়ে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রবেশাধিকারও ছিল নিষিদ্ধ। এই সুবাদে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও কোটি কোটি টাকার দালালি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন ওই নারী।
সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে মিরপুরে অপশাসন চালানো তাবেদুন নবী নিজেকে সাবেক ছাত্রদল সভাপতি, প্রভাবশালী সচিব কিংবা অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকদের (CRAB) নেতাদের ঘনিষ্ঠ বলে ভয় দেখাতেন। আবার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে সাবেক শাসকদলের নেতাদের আত্মীয় পরিচয়ও দিতেন। শেখ সোহেল রানা, ইমামুল, শাহরিয়ার জনি ও রাদিউজ্জামানদের নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন অজেয় এক জালিয়াতি চক্র।
সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা: বীর মুক্তিযোদ্ধার কাছে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি
কেবল কোটি টাকার বাণিজ্যই নয়, একাত্তরের বীর সন্তানদের সঙ্গে প্রতারণাতেও পিছপা হননি এই কর্মকর্তা ও তার সহযোগীরা। ১ নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করা বীর মুক্তিযোদ্ধা জাফর উল্ল্যাহ নম্বর মিরপুর-৬ নম্বরের একটি প্লটের জন্য আবেদন করলে, ইতিবাচক প্রতিবেদন দাখিল ও প্লট পাইয়ে দেওয়ার নামে তার কাছে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন তাবেদুন নবীর দফতরে কর্মরত দুই উপ-সহকারী প্রকৌশলী।
মুক্তিযোদ্ধা জাফর উল্ল্যাহ প্রতিকার চেয়ে ততকালীন প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ করলেও, নির্বাহী প্রকৌশলী তাবেদুন নবী পুরো ঘটনাকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
নীতিমালার তোয়াক্কা না করে ‘সচিব-চেয়ারম্যান’ কোটায় ফ্ল্যাট বণ্টন
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি নীতিমালা রয়েছে—যার বাইরে বরাদ্দের কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু জাগৃক-এ নজিরবিহীনভাবে চালু করা হয় ‘সচিব কোটা’ ও ‘চেয়ারম্যান কোটা’।
অনুসন্ধানী নথিতে দেখা যায়, চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি নির্বাহী প্রকৌশলী জোয়ারদার তাবেদুন নবীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে স্বপ্ন নগর-২ প্রকল্পের ১,৫৪৫ ও ১,৩৩৮ বর্গফুটের ৬টি অবিক্রীত মূল্যবান ফ্ল্যাট অবৈধভাবে তথাকথিত ‘সচিব কোটায়’ বরাদ্দ দেওয়া হয়। আইনের ৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে কোনো ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া নিষিদ্ধ হলেও, শীর্ষ কর্মকর্তাদের খুশি রাখতে ও নিজের পদ বাচাতে এই নীতিবহির্ভূত বরাদ্দের নির্বাহী নির্দেশক হিসেবে কাজ করেন তাবেদুন নবী।
কোটি টাকার গণমাধ্যম ‘ম্যানেজ’ ও হাস্যকর ‘তিরস্কার’
হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সুবিশাল জালিয়াতির থলের বিড়াল বের হতে শুরু করলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়। তবে অদৃশ্য খুঁটির জোরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত না করে দেওয়া হয়েছে স্রেফ এক টুকরো ‘তিরস্কার পত্র’!
অভিযোগ রয়েছে, এই হাস্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসা নিজের কুকীর্তির খবর মুছে ফেলতে ডিল করছেন এই কর্মকর্তা। তথ্য গোপন ও সংবাদ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে বিভিন্ন মাধ্যমকে ১০ থেকে ১৫ লাখ, কোথাও আবার ১.৫ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দেওয়ার তথ্য-প্রমাণ ইতোমধ্যে সংরক্ষিত রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্পদের আমানতদার হয়েও ক্ষমতার দাপট, নীতিহীন কোটা প্রথা এবং ঘুষ বাণিজ্যের যে জাল প্রকৌশলী তাবেদুন নবী বিস্তার করেছেন—তা কেবল প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলাই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতিমালার ওপর এক চরম আঘাত। সচেতন মহলের দাবি, প্রহসনের ‘তিরস্কার’ নয়, এই দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে দুদকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।