দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় প্রায় ১৩০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচলকে যুক্ত করতে নেওয়া এই প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশনে প্রথম সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) পাঠিয়ে এ ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে।
মূল প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন পেলে ব্যয় বাড়বে প্রায় ১২৯ দশমিক ৮২ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত মেয়াদ পরিবর্তন করে ২০৩৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
- ঋণ ও সরকারি অর্থায়নেও বড় পরিবর্তন
সংশোধিত প্রস্তাবে জাপানি ঋণের পরিমাণ ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি ৩২ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫ হাজার ৫৩৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ঋণের পরিমাণ বাড়ছে ১১৬ দশমিক ৮২ শতাংশ।
অন্যদিকে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫ হাজার ২৫৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি অর্থায়ন বাড়ছে ১৬৮ দশমিক ৯২ শতাংশ।
এর আগে চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি ডিএমটিসিএল পরিকল্পনা কমিশনকে জানিয়েছিল, প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৮৩ শতাংশ বেড়ে ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কাছাকাছি যেতে পারে। নতুন প্রস্তাবে সেই ব্যয় আরও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
- ঠিকাদারদের বেশি দরেই মূল ব্যয় বৃদ্ধি
ডিএমটিসিএল ও পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, দরপত্রে ঠিকাদারদের প্রস্তাবিত মূল্য মূল প্রাক্কলনের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে। এর পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং দেশি-বিদেশি বাজারে মূল্যস্ফীতিও ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি মোট ১২টি কন্ট্রাক্ট প্যাকেজে ভাগ করা হয়েছে। এসব প্যাকেজের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৩৭ হাজার ৬৫৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। সর্বশেষ ঠিকাদারদের দর ও সংশোধিত প্রাক্কলনে তা বেড়ে ৮০ হাজার ৯৯৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, রামপুরা স্টেশনের উত্তর পাশ থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ অংশের সিপি-০৪ প্যাকেজের মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৩৩০ কোটি ২০ লাখ টাকা। পরবর্তী প্রাক্কলনে তা বেড়ে ১৩ হাজার ২৬৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা হয়। দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান ১৪ হাজার ৯৮৮ কোটি ৭ লাখ টাকার প্রস্তাব দেয়।
আবার নদ্দা স্টেশন থেকে বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ অংশের সিপি-০৬ প্যাকেজের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৬০৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সেখানে সর্বনিম্ন দরপ্রস্তাব এসেছে ১০ হাজার ৮২১ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
- সীমিত প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পটির দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জাপানি অর্থায়নের প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগসহ কিছু শর্তের কারণে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ বেশি তৈরি হয়।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) মাধ্যমে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত নকশা ও প্রাক্কলনে পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন কাজের ব্যয় বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকেও প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ, দরপত্রের প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়ার ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাদের মতে, এত বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে ব্যয়ের তুলনা এবং প্রকল্পের আর্থিক যৌক্তিকতা যাচাই করা প্রয়োজন
- প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় নিয়েও তুলনা
বিভিন্ন দেশের মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করলে ঢাকার এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় নিয়ে আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পর্যালোচনা তথ্য অনুযায়ী, ভারতের পাটনায় প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় প্রায় ৪০.৭৭ মিলিয়ন ডলার। রিয়াদে এই ব্যয় প্রায় ১৬৬ মিলিয়ন এবং দুবাইয়ে প্রায় ১৮৮ মিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে ঢাকার এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় ২২৬.৭৪ থেকে ২৫৩.৬৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর কথা বলা হচ্ছে।
- প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা
এমআরটি লাইন-১-এর মোট দৈর্ঘ্য ৩১ দশমিক ২৪১ কিলোমিটার। এর মধ্যে বিমানবন্দর রুটের দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার এবং পুরো অংশটি ভূগর্ভস্থ। এ রুটে ১২টি স্টেশন থাকবে।
অন্যদিকে ১১ দশমিক ৩৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ পূর্বাচল রুটে উড়াল ও ভূগর্ভস্থ—দুই ধরনের ব্যবস্থা থাকছে। এই অংশে সাতটি উড়াল ও দুটি ভূগর্ভস্থ স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের ১২টি প্যাকেজের মধ্যে ডিপো এলাকার ভূমি উন্নয়নসংক্রান্ত সিপি-১ প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ১১টি প্যাকেজের ক্রয় প্রক্রিয়া বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
ঠিকাদারদের উচ্চ দর নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় কয়েকটি প্যাকেজের দরপত্র প্রক্রিয়া স্থগিতও করা হয়েছিল। ব্যয় কমানোর বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, ডিএমটিসিএল ও সড়ক পরিবহন বিভাগ জাইকা এবং জাপানের সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল জাপান সফরও করেছে।
তথ্যসূত্র: সংশ্লিষ্ট প্রকল্প ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্র