মাগুরার জাগলা ইউনিয়নের আঙ্গারদাহ গ্রামে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী শিল্প কারখানা। উদ্যোক্তা সাউয়াদা ইসলাম স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য পেঁপের নল, শজনের ডাল-পাতা, নারকেলের ছোবড়া, আম ও নিমগাছের চিকন ডাল এবং পাকচং ঘাস ব্যবহার করে পোষা প্রাণীর জন্য প্রায় ৪০০ ধরনের খাবার, পোশাক ও খেলনা তৈরি করছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বোল্ড পার্টনারস লিমিটেড’ নামের এই প্রতিষ্ঠানটি এখন জাপান, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত দেশে পণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল থেকে গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বোল্ড পার্টনারস লিমিটেড মোট ২৭ লাখ ৩৬ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৪০ পয়সা ধরে যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। রপ্তানির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে জাপান, এরপরই রয়েছে কানাডার অবস্থান। প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে সাউয়াদা ইসলামের এই উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার করেছে এবং নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মাগুরা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে প্রায় ২৫ একর জমিতে বিস্তৃত এই কারখানায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০০ স্থানীয় নারী কাজ করছেন। কারখানার কর্মপরিবেশ সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। এখানে চারটি পৃথক অংশে পোষা প্রাণীর পোশাক, খেলনা, খাবার ও স্ন্যাকস এবং ঘাস প্রক্রিয়াজাত করা হয়। কর্মীদের নিপুণ হাতে তৈরি এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে কুকুরের জন্য চামড়ার বেল্ট, পাখির শৈল্পিক বাসা এবং খরগোশ বা গিনিপিগের জন্য বিশেষ খাবার। কুকুরের দাঁত পরিষ্কার রাখতে নিমের ডাল চিবানোর মতো অভিনব পণ্যও এখানে তৈরি হচ্ছে।
উদ্যোক্তা সাউয়াদা ইসলাম জানান, যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা ও ব্যবসার পর জাপানে বসবাস করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি শিকড়ের টানে দেশে ফিরে আসেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল স্থানীয় মানুষকে স্বাবলম্বী করা। ২০১৮ সালে মাত্র চার-পাঁচজন কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম চালানেই জাপানে তিন হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করে তারা সফলতার মুখ দেখে। তাঁর এই উদ্যোগ দেখে জাপান ও সিঙ্গাপুরের দুটি প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে।
কারখানার কাঁচামাল সংগ্রহের মাধ্যমেও স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামের মানুষ পেঁপের নল, আম ও নিমের ডাল বা ঘাস সংগ্রহ করে কারখানায় সরবরাহ করেন, যার বিনিময়ে তাঁরা নগদ অর্থ পান। সুপ্রিয়া রানীর মতো প্রায় ২০০ নারী শ্রমিক সরাসরি কারখানায় কাজ করেন এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহনে যাতায়াত করেন। এছাড়া আরও ৩০০ নারী বাড়িতে বসেই পণ্য তৈরির কাজ করছেন, যা তাঁদের সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা এনেছে।
সাউয়াদা ইসলাম বলেন, মাটির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি এই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে পোষা প্রাণীর খাবার ও খেলনার বিশাল বাজার রয়েছে, যেখানে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের আধিপত্য থাকলেও বাংলাদেশের সম্ভাবনা প্রচুর। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি জেলায় এমন অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে, যা বিশ্ববাজারের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে।
নিজের এই প্রকল্পকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সাউয়াদা ইসলামের। প্রায় ২৫ একর জমির একটি বড় অংশে তিনি কাঁচামাল হিসেবে বিভিন্ন গাছ ও ঘাস চাষ করছেন। স্থানীয় উপকরণকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদনের এই মডেল এখন মাগুরার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের অন্যান্য প্রান্তেও উদ্যোক্তা তৈরির অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।
বাড়ির আশপাশে পড়ে থাকা সাধারণ উপাদান দিয়ে বিশ্ববাজারের উপযোগী পণ্য তৈরির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন মাগুরার জাগলা এলাকার আঙ্গারদাহ গ্রামের উদ্যোক্তা সাউয়াদা ইসলাম। ষাট ছুঁই ছুঁই সাউয়াদা ইসলাম গ্রামীণ অর্থনীতিতে খুলে দিয়েছেন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।
কেউ ব্যস্ত কাপড় ও চামড়া দিয়ে কুকুরের জন্য আকর্ষণীয় বেল্ট তৈরিতে। আবার দলবেঁধে নারীরা ঘাস, শজনের ডাল, ডাঁটা ও পাতা শুকাচ্ছেন। কর্মকর্তারা জানান, কারখানাটিতে চারটি অংশ রয়েছে। ঘাস দিয়ে তৈরি করা ইঁদুরের ঘর যাচ্ছে কানাডায়।
মাগুরা শহরের কেশব মোড় এলাকায় জন্ম নেওয়া সাউয়াদা ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষ করে সেখানে ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেন। পারিবারিক কারণে একসময় যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে জাপানে পাড়ি জমান।
আর এই ঋণ শোধ করার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। সাউয়াদা ইসলাম জানান, ‘কাউকে মাছ না দিয়ে বড়শি দিয়ে মাছ ধরা শেখানোর’ দর্শন এবং বয়োবৃদ্ধ মা-বাবার পাশে থাকার তাড়না থেকেই তিনি জন্মস্থান মাগুরায় ফিরে আসেন।
এরপর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন কর্মীর প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় এলাকার সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কারখানাতেই তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা হয়।
বিদেশ থেকে পণ্যের বিপুল চাহিদা থাকায় বেশি পণ্য উৎপাদন করতে এখন অন্যদের কাছ থেকেও কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি এখানে কাজ করে জমি কিনেছি, বাড়ি করেছি, সংসারের অনেক চাহিদাই পূরণ হয়েছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, বাড়িতে থেকেই চাকরি করতে পারছি।’
এর পাশাপাশি আরও ৩০০ নারী বাড়িতে বসেই বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে দেন বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। বর্তমানে এই বাজারের বড় অংশ ভারত, চীন ও ভিয়েতনাম দখলে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো প্রায় শূন্যের কোঠায় আছে।