শিখা ইন অগ্নিকাণ্ড এ কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তসহ একই পরিবারের চারজন নিহত হয়েছেন। মর্মান্তিক ঘটনায় কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ায় শোক নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমিন। তাঁদের তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশীষ দত্তও মারা গেছে। এ ছাড়া প্রাণ হারিয়েছেন দেবাশীষের শ্বশুর আকরাম আলী।
শিখা ইন অগ্নিকাণ্ড একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন দেবাশীষ। তাঁর সঙ্গে স্ত্রী, ছেলে ও শ্বশুর ছিলেন।
গত ৩ আগস্ট তাঁরা ভারতের বেঙ্গালুরু যান। সেখানে ১৬ দিন চিকিৎসা চলে। এরপর ১৮ আগস্ট তাঁরা কলকাতায় পৌঁছান।
দেশে ফেরার আগে তাঁদের কেনাকাটার পরিকল্পনা ছিল। তাই কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের শিখা ইন হোটেলে ওঠেন তাঁরা।
মহিমার সঙ্গে বাবার শেষ ভিডিও কল
মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে মেয়ে মহিমার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেন দেবাশীষ। মেয়েকে কেনাকাটার কিছু জিনিসও দেখান তিনি।
মহিমার জন্য নতুন জামা ও চকোলেট কেনার কথা জানিয়েছিলেন দেবাশীষ। বুধবার তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল।
তবে সেই ফেরা আর হয়নি। বাবা-মা ও ছোট ভাইকে হারিয়ে সাত বছরের মহিমা এখন শোকে স্তব্ধ।
অন্যদিকে দেবাশীষের ভায়রা মিটুও তাঁদের সঙ্গে বেঙ্গালুরু গিয়েছিলেন। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে মঙ্গলবার দেশে ফেরায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
কলকাতার হোটেলে গভীর রাতে আগুন
মঙ্গলবার দিবাগত রাত ২টার দিকে হোটেলে আগুন লাগে। তখন দেবাশীষ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা গভীর ঘুমে ছিলেন।
এরপর দ্রুত পুরো হোটেল কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা সেখানে অভিযান শুরু করেন।
হোটেল থেকে ৬০ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাঁদের মধ্যে নয়জন অচেতন অবস্থায় ছিলেন। পরে হাসপাতালে তাঁদের মৃত ঘোষণা করা হয়।
নিহতদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে দেবাশীষের পরিবারের চার সদস্য রয়েছেন। বুধবার নিহতদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
শিখা ইন অগ্নিকাণ্ড কারণ নিয়ে তদন্ত
আগুনের সূত্রপাত নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে।
একই সঙ্গে হোটেলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রাণহানির পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
কলকাতার নিরাপত্তাসংক্রান্ত সরকারি তথ্য কলকাতা পুলিশের ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।
শিখা ইন অগ্নিকাণ্ড পর কুষ্টিয়ায় শোক
বুধবার বিকালে কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ায় দেবাশীষের বাড়ির সামনে শত শত মানুষ জড়ো হন। স্বজন ও প্রতিবেশীরা পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিতে আসেন।
এ সময় বাসার ভেতর থেকে আহাজারির শব্দ ভেসে আসছিল। দেবাশীষের মা স্বপ্না দত্ত স্বজনদের ছবি জড়িয়ে বিলাপ করছিলেন।
পাশেই ছিল ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতির ছবি। আত্মীয়রা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবুও থামছিল না তাঁর আহাজারি।
একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বপ্না দত্ত। বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। পুরো বাড়িতে তখন শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়।
সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের কর্মজীবন
দেবাশীষ দত্ত দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়ায় সাংবাদিকতা করছিলেন। তিনি আজকের পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
এ ছাড়া তিনি চ্যানেল নাইনের প্রতিনিধি ছিলেন। স্থানীয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এর আগে বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে কাজ করেছেন দেবাশীষ। তাঁর মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক মহলে গভীর শোক নেমে এসেছে।
এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আরও খবর পাওয়া যাবে দৈনিক বাংলাভিউয়ের সর্বশেষ সংবাদে।
পরিবারের সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
দেবাশীষের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জীবনেও এখন বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ পুরো পরিবার তাঁর আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার দত্ত হৃদ্রোগে আক্রান্ত। তাঁর স্ত্রীও অসুস্থ। তাই দুজনের নিয়মিত চিকিৎসা প্রয়োজন।
প্রতি মাসে তাঁদের ওষুধে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। এখন সেই ব্যয় নিয়েও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি বাসাভাড়া ও নাতনি মহিমার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন বৃদ্ধ দম্পতি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়েছেন তাঁরা।
এক রাতেই ভেঙে গেল সাজানো সংসার
নয় বছর আগে আফসানাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন দেবাশীষ। দুই সন্তানকে ঘিরে তাঁদের সাজানো সংসার ছিল।
সেই সংসার ঘিরে ছিল অসংখ্য স্বপ্ন। কিন্তু ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড মুহূর্তের মধ্যে তাঁদের জীবন বদলে দিয়েছে।
এখন মহিমার কাছে রয়ে গেছে বাবা-মা ও ভাইয়ের স্মৃতি। অন্যদিকে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সামনে রয়েছে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তা।