প্রতিরক্ষা শিল্পে তুরস্কের অভাবনীয় উত্থান: আমদানিকারক থেকে বিশ্বমানের রপ্তানিকারক

মাত্র আড়াই দশকের ব্যবধানে তুরস্ক তার প্রতিরক্ষা শিল্পে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে। একসময় সামরিক সরঞ্জামের জন্য বিদেশনির্ভর দেশটি এখন নিজস্ব যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধজাহাজ তৈরির সক্ষমতা অর্জন করে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।

২০০২ সালে তুরস্কে প্রতিরক্ষা খাতে কোম্পানির সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৬টি, যা বর্তমানে বেড়ে সাড়ে ৪ হাজারের বেশি হয়েছে। একই সময়ে প্রতিরক্ষা প্রকল্পের সংখ্যা ৬২ থেকে বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০-তে পৌঁছেছে। এই প্রকল্পগুলোর মোট আর্থিক মূল্য ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এখন ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের রপ্তানিতে উল্লম্ফন

তুরস্কের প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ খাতের রপ্তানি আয়েও এসেছে বিশাল উল্লম্ফন। ২০০২ সালে এই খাতের রপ্তানি ছিল মাত্র ২৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা ২০২৫ সালে ১০ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই ৫ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলারের সামরিক ও মহাকাশ পণ্য রপ্তানি হয়েছে। জুলাই পর্যন্ত বার্ষিক হিসাবে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।

বর্তমানে তুরস্ক বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম প্রতিরক্ষা রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে স্বীকৃত এবং খুব দ্রুতই শীর্ষ দশের তালিকায় প্রবেশের পথে রয়েছে।

ড্রোন ও যুদ্ধবিমান নির্মাণে অগ্রগতি

এই রূপান্তরের অন্যতম বড় প্রতীক তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি। বাইকার নির্মিত বায়রাকতার টিবি২ ড্রোন সিরিয়া, লিবিয়া, কারাবাখ ও ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছে। এরপর আকিঞ্জি এবং মনুষ্যবিহীন যুদ্ধবিমান কিজিলেলমা তুরস্কের ড্রোন সক্ষমতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে।

আকাশ প্রতিরক্ষার পাশাপাশি যুদ্ধবিমান তৈরিতেও বড় অগ্রগতি হয়েছে। তুর্কিশ অ্যারোস্পেস তৈরি করছে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’, উন্নত প্রশিক্ষণ ও হালকা যুদ্ধবিমান ‘হুরজেট’ এবং বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ও হেলিকপ্টার।

কান যুদ্ধবিমান ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম সফল উড্ডয়ন সম্পন্ন করেছে। ইন্দোনেশিয়া এরই মধ্যে ৪৮টি কান যুদ্ধবিমান কেনার চুক্তি করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুদ্ধজাহাজ ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা

সমুদ্রেও নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে তুরস্ক। দেশটির মিলগেম প্রকল্পের মাধ্যমে করভেট ও ফ্রিগেটসহ বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের সাবমেরিন এবং আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধজাহাজ তৈরির কাজও চলমান রয়েছে।

তুরস্কের তৈরি টিসিজি আনাদোলু থেকে ড্রোন পরিচালনার নতুন ধারণাও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে রকেটসান। আর রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, যোগাযোগ ও নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তিতে বড় ভূমিকা রাখছে আসেলসান।

হিসার ও সিপার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং ‘স্টিল ডোম’ নামে বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ করছে দেশটি।

স্থল প্রতিরক্ষা ও দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ

স্থল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও তুরস্কের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। আলতাই প্রধান যুদ্ধট্যাংকের পাশাপাশি এফএনএসএস ও ওতোকারের তৈরি বিভিন্ন সাঁজোয়া যান এখন আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হচ্ছে।

প্রতিরক্ষা শিল্পে বর্তমানে তুরস্কে এক লাখের বেশি মানুষ সরাসরি কাজ করছেন। গত ২৫ বছরে তুরস্কের গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় ৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তির ব্যবহারও ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৫ শতাংশের বেশি হয়েছে।

বর্তমানে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের পণ্য প্রায় ১৮৫টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে এবং প্রায় ২৩০ ধরনের পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশ্ববাজারে তুরস্কের শক্ত অবস্থান

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলাই তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের সবচেয়ে বড় অর্জন।

যুদ্ধবিমান থেকে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র থেকে যুদ্ধজাহাজ—সব ক্ষেত্রেই দেশটি এখন নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্ত্রবাজারে শক্ত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে।

এই অগ্রযাত্রায় ডেইলি সাবাহ, রকেটসান, তুসাস, বাইকারটেক ও আসেলসানের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তুরস্কের এই অপ্রতিরোধ্য গতি বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে দেশটির প্রভাবকে আরও সুসংহত করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *