চলতি মাসের ২০ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই হতে যাচ্ছে তার প্রথম ভারত সফর।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই এই সফরের চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ধারিত হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই প্রতিবেশী দেশের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যাগুলো নিরসনের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনে এই সফর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে।
সফরের আলোচ্যসূচিতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি, বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি সরবরাহ, ভিসা জটিলতা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পাওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া, ভারতে অবস্থানরত পদচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার (প্রত্যর্পণ) বিষয়টিও আলোচনার টেবিলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, ভারত তাদের বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার গণমাধ্যমে উপস্থিতির ঘটনায় ঢাকা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সরকারের মতে, তার মন্তব্য বাংলাদেশের বিচার বিভাগ ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আমেনা মহসিন মনে করেন, এ ধরনের উত্তেজনার পরও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।
তবে তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে হাসিনা যাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে এমন কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য না দেন, তা নিশ্চিত করা ভারতের দায়িত্ব।
প্রত্যর্পণ চুক্তির বিষয়ে আমেনা মহসিন বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত রাজনৈতিক। তবে সরকারপ্রধানদের সরাসরি আলোচনায় অনেক সময় জটিল সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যায়। তিনি বাংলাদেশের অগ্রাধিকার হিসেবে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, পুশ-ইন রোধ এবং বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের ওপর জোর দেন। তিনি আরও বলেন, ভারত এতদিন কেবল সরকার-কেন্দ্রিক নীতি অনুসরণ করলেও এখন তাদের সামনে জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক এই সফরকে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করেন। তার মতে, তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে না গিয়ে পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফরের মাধ্যমে সম্পর্কের উত্তেজনা প্রশমিত করতে চেয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরের পরিপূরক এবং বিচ্ছিন্ন থাকার সুযোগ নেই।
তবে দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে দেশের ভেতরে যে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে, তা সামাল দিতে ভারতের পক্ষ থেকে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ বা সদিচ্ছার নিদর্শন প্রয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক আলতাফ পারভেজ মনে করেন, তারেক রহমান ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিলে চীন, রাশিয়া ও ব্রাজিলের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পেতেন। তবে ভারতের সঙ্গে এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠককেও তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তার মতে, এই বৈঠক উভয় পক্ষকে তাদের প্রত্যাশা সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনার সুযোগ করে দেবে। বিশেষ করে জ্বালানি ও গঙ্গা চুক্তির মতো বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে ইতিবাচক নিশ্চয়তা পাওয়া গেলে তা বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে।
তারেক রহমানের চীন সফরের পর বেইজিংয়ের তিস্তা প্রকল্পে আগ্রহ প্রকাশ ভারতকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলেছে বলে মনে করেন আলতাফ পারভেজ। তার মতে, এই প্রেক্ষাপটে সফরটি সফল করার ক্ষেত্রে ভারতের নিজস্ব দায়বদ্ধতা রয়েছে। হাসিনা ইস্যু নিয়ে তিনি মনে করেন, দুই দেশ সম্ভবত বিষয়টি লোকচক্ষুর অন্তরালে সমাধান করতে চাইবে। তবে ভারত ইস্যুতে দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করা বিএনপি সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে, যা নেতৃত্বের দৃঢ়তার ওপর নির্ভর করবে।
এমনটি বলছেন পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকেরা। তিনি আরও বলেন, ‘ভারতকে বুঝতে হবে যে কেবল সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই যথেষ্ট নয়, বরং জনগণের সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি।’