রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের নয় বছর পূর্তির প্রাক্কালে মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকার জানিয়েছে, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে তারা বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত।
শনিবার (১৫ আগস্ট) দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘোষণা দেয়। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দাবি, জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন শরণার্থীর তালিকা যাচাই করে তারা ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাকি ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং ৪ হাজার ২৪১ জন ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে’ জড়িত বলে তাদের দাবি। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাচাইকৃত এসব বাসিন্দাকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।
তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আন্তর্জাতিক দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় এবং উত্তর রাখাইনে ২ লাখের বেশি মানুষ রয়ে যায়।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই বছরের একটি প্রত্যাবাসন কাঠামোতে সম্মত হলেও ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেই উদ্যোগ থমকে যায়। এরপর ২০২৩ সালে রাখাইনভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে জান্তা বাহিনীর নতুন করে সংঘাত শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে। বর্তমানে রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকায় প্রত্যাবাসনের পরিবেশ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এদিকে, মিয়ানমারে ফেরার বাস্তব সম্ভাবনা না থাকায় এবং আন্তর্জাতিক সহায়তায় কাটছাঁট হওয়ায় অনেক রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় বাধ্য হচ্ছেন।
এর আগে জুলাই মাসে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার তাদের দেশে থাকা ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে। তবে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অং এপি’কে জানান, ওই কর্মসূচি শুধুমাত্র মালয়েশিয়ার আটককেন্দ্রে থাকা যাচাইকৃত মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য এবং এটি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নয়।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ভয়াবহ দমন-পীড়নের মুখে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সহিংসতার কারণে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। জাতিসংঘের মতে, ২০১৭ সালের সেই সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা ও নৃশংসতা ছিল গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের শামিল। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ অবশ্য রোহিঙ্গাদের তাদের ১৩৫টি স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত মনে করে না এবং তাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে।
কিন্তু ২০২১ সালে দেশটির সেনাবাহিনী নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর সেই উদ্যোগ ভেস্তে যায়।
এতে মিয়ানমারে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে ব্যাপক সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়।
অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলা এই যুদ্ধে আরও বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
অযোগ্য ও অনিরাপদ নৌযানে করে তারা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উদ্দেশে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করছেন।
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে মিয়ানমার সরকার সম্মত হয়েছে- এমন প্রতিবেদনও তিনি নাকচ করে দিয়েছিলেন।
২০১৭ সালের সামরিক অভিযানের ব্যাপকতা, পরিকল্পনা ও নৃশংসতার কারণে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের ব্যাপক অভিযোগ তোলে।